ডায়রিয়া ও বমিজনিত পানিশূন্যতা থেকে জীবন বাঁচাতে ওরস্যালাইন (ORS) একটি বিশ্বস্বীকৃত ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভুল নিয়মে ওরস্যালাইন ব্যবহার শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—অল্প পানিতে ওরস্যালাইন গুলে খাওয়ানো বা ডাবের পানির সঙ্গে মেশানো শিশুর কিডনি বিকল হওয়া পর্যন্ত গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
কীভাবে সমস্যা তৈরি হয়?
ওরস্যালাইন একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে লবণ ও গ্লুকোজের সমন্বয়। এটি কাজ করে তখনই, যখন তা নির্ধারিত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানিতে গুলে খাওয়ানো হয়।
কিন্তু অনেক অভিভাবক পুরো প্যাকেট ওরস্যালাইন আধা লিটার বা তারও কম পানিতে গুলে ফেলেন অথবা ডাবের পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেন। ফলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত লবণ প্রবেশ করে।
এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Hypernatremia বা লবণের বিষক্রিয়া—যেখানে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
শিশুর শরীরে কী ঘটে?
শিশুর কিডনি খুবই সংবেদনশীল। অতিরিক্ত লবণ শরীরে ঢুকলে—
- কিডনি রক্ত থেকে লবণ ছেঁকে বের করতে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে
- শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে গিয়ে মারাত্মক পানিশূন্যতা তৈরি হয়
- মস্তিষ্কে পানি কমে গিয়ে খিঁচুনি, অচেতনতা এমনকি কোমা পর্যন্ত হতে পারে
- কিডনি অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে যেতে পারে
অনেক ক্ষেত্রে শিশুর প্রস্রাব কমে যায়, শরীর ফুলে ওঠে, শ্বাসকষ্ট হয় এবং দ্রুত হাসপাতালে না নিলে জীবননাশের ঝুঁকি দেখা দেয়।
ডাবের পানির সঙ্গে স্যালাইন কেন বিপজ্জনক?
ডাবের পানিতে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু লবণ ও মিনারেল থাকে। যখন তার সঙ্গে আবার ওরস্যালাইন মেশানো হয়, তখন—
- লবণের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যায়
- শরীরের স্বাভাবিক ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়
- শিশুর কিডনি ও মস্তিষ্কে মারাত্মক চাপ পড়ে
এটি অনেক সময় অভিভাবকদের অজান্তেই শিশুর মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে।
সঠিক নিয়ম কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে—
- ওরস্যালাইনের প্রতিটি প্যাকেট নির্ধারিত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানিতে (যা প্যাকেটে লেখা থাকে) গুলতে হবে
- কখনোই অর্ধেক পানি, ডাবের পানি, জুস বা অন্য কোনো তরলের সঙ্গে মেশানো যাবে না
- মিশ্রণ তৈরির পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার শেষ করতে হবে
সচেতনতা জরুরি
ডায়রিয়া শিশুদের একটি সাধারণ রোগ হলেও ভুল ওরস্যাল্যালাইন প্রয়োগ সেটিকে প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে। তাই প্রতিটি মা–বাবা ও অভিভাবকের জানা অত্যন্ত জরুরি—
যে ওরস্যালাইন জীবন বাঁচায়, ভুল নিয়মে সেটিই শিশুর কিডনি ধ্বংস করতে পারে।
জনসচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানই পারে এই নীরব বিপদ থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে।

